মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে- অধ্যক্ষ কয়সার আহম্মদ দুলাল (পর্ব-৬০)

প্রকাশিত: ৮:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ৯, ২০২০ | আপডেট: ৮:৩০ অপরাহ্ণ

গৃহবন্দীর জবানবন্দী——৬০

(হোম কোয়ারেন্টাইন জার্ণাল)

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য অস্হায়ী সরকারের পরিচালনায় স্বাধীনতাকামী মানুষের অংশ গ্রহনের মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে ।নিরস্ত্র বাংগালী নানান কৌশলে অস্ত্র সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন । মা বাবা , স্স্ত্রী পরিজন ছেড়ে দেশ মাতৃকার টানে বাড়ী থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন । অনেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষন গ্রহন করে , কেউবা দেশের অভ্যন্তরে সেক্টর কমান্ডের অধীনে যার যেভাবে যেখানে সুযোগ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পৃক্ত হয়েছেন ।সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাংগালী সৈনিকরা বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করলে রণ কৌশলে যোগ হয় নতুন মাত্রা ।অবসর প্রাপ্ত সৈনিকরা যুদ্ধের মাঠ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র কাঁধে তুলে নেয় ।সাধারন মানুষকে প্রশিক্ষন দিয়ে তাঁরা উপযোগী করে তোলেন ।

৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে ভোলা মহকুমা (বর্তমানে জেলা) ।অক্টোবর মাসে পাতার হাট মেহেন্দী গন্জ পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় ।এই যৃদ্ধে মুলাদীর কুদ্দুস মোল্লা , মেহেন্দী গন্জের মজিবর রহমান সানু , সেনা বাহিনীর আবদুল খালেক , আবদুল আজিজ , সামছুল হক ,আবদুর রব ,আবদুল কাদের , সৈয়দ আবদুল আলিম , ইন্ডিয়া থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে আসা মোজাম্মেল হক জমাদার , সৈয়দ আবদুল মান্নান , এবং ভোলার রফিক চৌধুরী, রতন চৌধুরী নেতৃত্ব প্রদান করেন । চরফ্যাসনের অনেক মুক্তিযোদ্ধা দেশের বিভিন্ন স্হানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন ।পাতার হাটের যুদ্ধে চরফ্যাসনের মুক্তিযোদ্ধা কাইউম মিয়া ,হাসান মালতিয়া , আবুল কাশেম সহ অনেকে অংশ গ্রহন করেন । এই যুদ্ধের পর ভোলা , মেহেন্দী গন্জ চরফ্যাসনের মুক্তিযোদ্ধারা নদী পথে ভোলা অন্চলে প্রবেশ করেন ।

অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি ভোলার গুইগ্যার হাট , টনীর হাট বোরহান উদ্দিনের যুদ্ধে তারা অংশ গ্রহন করেন । মজিবুর রহমান সানু গ্রুপ পশ্চমের নদী পথে দক্ষিন দিকে আসতে ছিলেন । এসময় গুইগ্যার হাটে মুক্তিযোদ্ধা মুছুয়া সামছুর নেতুত্বে সস্হানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয় । শব্দ শুনে নদী থেকে তীরে উঠে পশ্চিম দিক থেকে সানুর গ্রুপ এই যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন ।।যুদ্ধ শেষে তারা হেকমা গজারিয়ার কাছাকাছি পৌঁছলে নদীতে পাক বাহিনীর টহলের গান বোড দেখতে পান। কৌশলগত ভাবে তারা জল পথ ছেড়ে স্হল পথে এসে বোরহান উদ্দিন হাই স্কুল ক্যাম্প করেন । ঐদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধা হাসান মালতিয়া ,পাতার হাটের আবদুল আজিজ এবং আবুল কাশেম চরফ্যাসন চলে আসেন । মুক্তিযোদ্ধা কাইউম মিয়া বোরহান উদ্দিন ক্যাম্পে থেকে যান ।

এসময় রাজাকার বাহিনীর মহকুমা প্রধান মোহাম্মদ টনী তাঁর বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রতারনা মূলক দাওয়াত দিয়ে ভোলা পাক বাহিনীকে সংবাদ দেয় । মুক্তিযোদ্ধারা টের পেয়ে খাবার ফেলে দিয়ে প্রতিরোধ করে । শুরু হয় টনীর হাটের ( বর্তমান বাংলা বাজার ) মুক্তিযুদ্ধ । এই যুদ্ধে চরফ্যাসনের ওবায়েদুল হক পিতা মোজাফ্ফর আলী সাং হাজারী গন্জ , ফজলুর রহমান পিতা মরকম আলী সিকদার সাং পূর্ব মাদ্রাজ , তোফাজ্জল হোসেন পিতা নাদের আলী সাং শরিফ পাড়া এবং দুলাল বাবু সহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায় । উল্লেখ্য ,দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধা রতন চৌধুরীর নেতৃত্বে নোয়াখালীর মাইজদী থেকে রাজকার নেতা মোহাম্মদ টনীকে গ্রেফতার করা হয় ।প্রথম তাকে রামদাস পুর আনা হয় । ভোলা সদরে এনে তার গলায় জুতার মালা দিয়ে ঘুড়ানো হয় ।তারপর মুজিব বাহিনী ,মুক্তি বাহিনী সহ সংগ্রাম কমিটির জেলা নেতৃবৃন্দ বাংলা স্কুল মাঠে হাজার হাজর মানুষের উপস্হিতিতে তার বিচার হয় ।জনতার দাবীতে ইলিশা সড়কে গুলী করে তাকে হত্যা করা হয় ।

বোরহান উদ্দীন হাই স্কুল ক্যাম্পে অবন্হান নেয়া মুক্তি যোদ্ধাদের সাথে সকাল বেলা পাকবাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয় । ভোলা থেকে মোহাম্মদ টনী সড়ক পথে রাজাকার বাহিনী নিয়ে পাকবাহিনীর সাথে যোগ দেয় । দীর্ঘক্ষন চলে এই যুদ্ধ । ভোলা জেলার সবচেয়ে বড় মুক্তিযুদ্ধ ছিল এটি ।তাৎক্ষনিক ভাবে এই যুদ্ধে হাই কমান্ড ছিদ্দিকুর রহমান , আনসার এ্যাডজুটেন্ড আলী আকবর বড় ভাই, রফিক চৌধুরীর নেতৃত্বে যুদ্ধ সংগঠিত হয় ।এই যুদ্ধে অনেক পাক বাহিনী হতাহত হয় । তবে এই যুদ্ধে বীর মুক্তি যোদ্ধা রফিক চৌধুরীর সামনে তাঁর সাহসী সন্তান দুলাল চৌধুরী শহীদ হওয়ার ঘটনা ছিল হৃদয় বিধারক । এই যুদ্ধে চরফ্যাসনের ল্যান্স নায়েক হাবিবুর রহমান পিতা হাজী আলতাফ হোসেন শেখ সাং চর নাজিম উদ্দিন মেহেন্দী গন্জের কয়ছর আহাম্মদ আখন , সুবল দাস সহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং অনেক মুক্তিযোদ্ধা সহ স্হানীয় অনেক মানুষ আহত হন । এসব মুক্তিযুদ্ধের বিস্তারিত তথ্য উপাত্ব ঘটনাস্হল এলাকায় স্হানীয় ভাবে সংগৃহীত হওয়া উচিত ।

বোরহান উদ্দিন যুদ্ধ শেষে মজিবুর রহমান সানুর গ্রুপ রাতের আঁধারে রানীগন্জ হয়ে অনেক পথ ঘুরে রমাগন্জ গ্যাস ফিল্ডের কাছে তোফাজ্জল সিকদার বাড়ি অবস্হান করেন । তারা সবাই তখন ক্লান্ত , ক্ষুধার্ত , অনেকে আহত । বোরহান উদ্দিন যুদ্ধ সম্পর্কে চরফ্যাসনের মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সংগ্রাম কমিটি কিছুই জানতেন না । একদিন পূর্বে বোরহান উদ্দিন থেকে আগত মুক্তিযোদ্ধা হাসান মালতিয়া , পাতার হাটের আ: আজিজ মিয়া এবং মুক্তিযোদ্ধা কাশেম মিয়ার তথ্যের ভিত্তিতে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন বোরহান উদ্দিন ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের চরফ্যাসন আমন্ত্রন জানানোর । রাতে চরফ্যাসন ওয়াফদার জীপ গ্রেজ ভেংগে বের করে সকালে হাসান মালতিয়া , কাশেম মিয়া ,ছালামত উল্লাহ মিয়া , আহাম্মদ ফুয়াদ , পাতার হাটের আবদুল আজিজ মিয়া বোরহান উদ্দিন রওয়ানা করেন । আ: আজিজ সেনাবাহিনীর লোক ।গাড়ী তিনি ড্রাইভ করেছিলেন ।

অনুরুপ ভাবে ডাক্তার রফিকুল ইসলাম ,আবদুল হাকাম মিয়া , বেল্লাল মিয়া, ভদ্রপাড়ার সালাহউদ্দিন মিয়াা সহ অনেকে বোরহান উদ্দিন পথে রওয়ানা করেছেন ।ফজল গন্জের ফকরুল মানিক তাঁর লোকজন সহ রেজাউল ড্রাইভারের আযাদ গাড়ী নিয়ে বোরহান উদ্দিনের পথে রওয়ানা করেন । অনেকেই বেশী দূর যেতে পারেননি । দূর থেকে গোলাগুলির শব্দ শুনে অনেককে পথেই থেমে যেতে হয়েছে । কিনতু ওয়াপদার জীপ উদয়পুর রাস্তার মাথা পর্যন্ত গিযে বোরহান উদ্দিন যুদ্ধের আলামত প্রত্যক্ষ করেন ।

কিছুদূর অগ্রসর হলে পশ্চিম থেকে পাকবাহিনীর আনাগোনা টের পেয়ে জীপ থামিয়ে সবাই পালানোর চেষ্টা করেন । কাশেম মিয়া গাড়ি থেকে নামা মাত্রই পাকবাহিনীর গুতিতে আহত হন।সবাই যার যার সুবিধামত পালাতে থাকেন । পাকবাহিনী ওয়াপদার গাড়ী খানা নিয়ে যায় । ঐ গাড়ী নিয়ে পশ্চিম দিকে ফিরলে পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনের শিকার হন । চরফ্যাসনের জীপখানা টেডিপুলের কাছে রাস্তার পাশে হোগলা বনে পড়ে যায় । যার বডি দেশ স্বাধীনের পর উদ্ধার করে আনা হয় । বোরহান ঊদ্দিনের যুদ্ধে ভদ্রপাড়ার আনোয়ার হোসেন মিন্টু মিয়ার মুক্তি গাড়ী (নং কুমিল্লা—১০ ) পাক বাহিনী আগুনে পুড়িয়ে দেয় । পরিবেশ নিয়ন্ত্রনে এলে মুজিবুর রহমান সানুর গ্রুপ চরফ্যাসনের উদ্দেশে উদয়পুর রাস্তার মাথায় একত্রিত হলে সবার সাথে দেখা হয় ।মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন জমাদার , নুরুল ইসলাম বাবুল সেখনে সানুর ট্রুপসের সাথে যোগ দেয় । তারা সবাই উদয় পুর রাস্তার মাথার পূর্ব পাশের এক আওয়ামীলীগ নেতার বাড়ী একদিন অবস্হান করেন ।পরদিন মেঘনা নদী দিয়ে নৌকায় লালমোহন থানার রায়চাঁদ এসে নামেন । আহত কাশেম মিয়া স্হল পথে তার শশুর বাড়ী ডাওরী এলাকায় চলে যান । ছালামত উল্লাহ মিয়া তাঁর ছেলে আহাম্মদ ফুয়াদ সহ স্হল পথে চরফ্যাসন পৌঁছেন ।মুজিবুর রহমান সানুর গ্রুপ রায়চাঁদ থেকে সুদুর পথ হেটে চরফ্যাসন ওসমান গন্জের নায়েবের পুল এলাকায় ক্ষেত্রমোহন দাস বাড়ী ক্যাম্প করেন ।

ক্যাম্পে অবস্হানরত মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ায় সহযোগিতা করেন স্হানীয় হিরোলাল চন্দ্র দাস , আ :রব হাওলাদার , হরিহর চন্দ্র দাস ,আ : রব ভূঁইয়া ,সোলেমান মিস্ত্রী , ওসমানগন্জ সংগ্রাম কমিটির সেক্রেটারী মোশারেফ হোসেন মাস্টার এবং কর্তার হাটের বশির মাস্টার সহ প্রমূখ । এই ক্যাম্পে তখন চরফ্যাসনের মুক্তিযোদ্ধা কাইউম মিয়া , হাসান মালতিয়া , নুরুল ইসলাম বাবুল , আলী হোসেন জমাদার অবস্হান করছেন ।এ সময় কর্তার হাটের মো :জহিরুল্লাহ ( পরবর্তী সময় চরফ্যাসন কলেজের প্রভাষক )এর সাথে স্হানীয় হিন্দুদের বিরোধ হয় । যা নায়েবের পুল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অভিযোগ উথ্থাপনের উপক্রম হয় ।

বিরোধের স্হানীয় মিমাংশার জন্য চরফ্যাসন থানা সংগ্রাম কমিটির সেক্রটারী ছালামত উল্লাহ মিয়া , মুকবুল আহাম্মদ খান নায়েবের পুল ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধা কাইউম মিয়াকে নিয়ে কর্তার হাট যান । কর্তার হাটের আওয়ামীলীগ নেতা বশির মাস্টার , ওসমান গন্জ সংগ্রাম কমিটির সেক্রেটারী মোশারেফ হোসেন মাস্টার সহ তাঁরা হিন্দুদের সাথে মো; জহির উল্লাহ এর বিরোধের সুস্ঠু সমাধান দেন । এ সময় নায়েবের পুল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে চলছে পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্পের সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান এবং মুক্তিযোদ্ধা সাইদুল হককে হত্যার প্রক্রীয়া ।(চলবে)

প্রকাশ: ৮/৬/২০২০