মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তরুন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিতে চাই। অধ্যক্ষ কায়সার আহম্মদ(পর্ব-৫৪)

প্রকাশিত: ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২, ২০২০ | আপডেট: ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ

গৃহবন্দীর জবানবন্দী—-৫৪

(হোম কোয়ারেন্টাইন জার্ণাল)

করোনা পরিস্হিতি নানা ভাবে প্রশ্ন বিদ্ধ। অধিক সচেতন মানুষ লক ডাউন কিংবা হোমকোয়ারেন্টাইন কঠোর ভাবে এখনও মেনে চলছেন । সরকার বহির্বিশ্বের ব্যবসায়িক কৌশলের সাথে তাল মিলিয়ে “স্বাস্হ্য বিধি মেনে চলা এবং সমামজিক দুরুত্ব বজায় রেখে সীমিত পরিসরে লকডাউন শিথিল করেছেন । মানুষ আর গৃহবন্দী নেই । আমার নিজের মধ্যেও একটা শৈথিল্য ভাব এসেছে ।দেশে করোনার আস্ফালন বেড়েছে। সেদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজনের বিদ্রুপাত্মক স্টাটাস দিয়েছে, উত্তরায় মানুষের চাপে করোনার মৃত্যু । সারা দেশে যে হারে মানুষের ঢল নেমেছে তাতে বাঘ মারতে শত্রু পাঠানোর মত । হয় করোনা মরবে ,নইলে আমরা মরবোে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ভোলা জেলায় প্রথম মুক্তিযুদ্ধ চরফ্যাসন পেয়ার আলী বেপারীর ক্যাম্পের যুদ্ধ ।জেলার অন্যান্য অংশে তখন পাকিস্তানী শাসক চক্রের মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং কৌশল চলছে । পাকিস্তানী শাসক চক্র এবং তাদের দোশর শান্তি কমিটি রাজাকার বাহিনী ভোলা জেলার বিভিন্ন যায়গায় তখন স্বাধীনতা পক্ষের মানুষের বাড়ী ঘর অগ্নি সংযোগ ,লুটতরাজ , হত্যা ,নির্যাতন চালাচ্ছে। কিন্তু মুখোমুখী যুদ্ধ শুরু হয়নি।

মে মাসে পাকিস্তানী মিলিটারী চরফ্যাসন মুখী হয়ে কর্তার হাট নিশি পন্ডিত বাড়ী , উত্তর ফ্যসনের দারিখ চন্দ্রদাস বাড়ী ,ননীদাস বাড়ী , লক্ষী মহাজন বাড়ী আগুন দেয় । সতিশ হাওলাদার বাড়ী সিদাম চন্দ্র দাসকে গুলী করে হত্যা করে । সতিশ চন্দ্র দাস বাড়ী বেড়াতে এসে লালমোহন মায়ার চরের হরেন্দ্র চন্দ্র দাস নামে একজন পান্জাবীদের গুলীতে নিহত হয় ।একই সময় দৌড়ে পালাতে যেয়ে পান্জাবীদের গুলীতে নিহত হয় শংকর চন্দ্রদাস নামে একজন শীশু ।আলী গাওঁ নাপিত বাড়ীর এবং আছলামপুর খোদেজাবাগ গ্রামের হিন্দু বাড়ীর গরু ছাগল তারা লুট করে।

পাক বাহিনী তাদের স্হানীয় দোসর শান্তি কমিটি, রাজকারদের সহায়তায় চরফ্যাসন বাজার লুটপাট করে এবং ভদ্রপাড়া বসবাস রত আওয়ামীলীগ নেতাদের বাড়ী ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয় দেয় ।বাজারের স্বর্ন ব্যবসায়ী রাধা গোবিন্দ দেবনাথকে রাজাকাররা পাক বাহিনীর হাতে তুলে দেয় ।তাকে নির্যাতন করে ভোলা ওয়াপদা পাকবাহিনীর হেডকোয়াটারে নিয়ে য়াওয়া হয়।পরবর্তীতে আর রাধা গোবিন্দের খোঁজ পাওয়া যায়নি ।হিন্দুবাড়ির ধান ক্রয়ের অপরাধে আলী গাঁয়ের রাজাকার মুজিবল হক মুন্সীর নেতৃত্বে দুলারহাট এলাকার চর তোফাজ্জল গ্রামের ধান ব্যবসায়ী হাছানআলী মাঝিকে ধরে এনে চরফ্যাসন ক্যাম্পে নির্যাতন করা হয় । মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কথা বলায় এই সময় চরফ্যাসন কারামাতিয়া আলীয়া মাদ্রাসা মসজিদের ঈমাম মীর মো: ইসরাইলকে ইমামের পদ থেকে বাদ দিয়ে তাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

ওসমান গন্জ, আবুবকরপুরের নতুন প্রজন্ম এবং পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্পের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী স্বাধীনতার স্বপক্ষের অনেক সচেতন মানুষ আমাকে প্রশ্ন করেছে ,পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্পের স্মৃতি ফলকে আবুবকর পুর বধ্য ভূমি লেখা কেন? ফলকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজ এবং শহিদ মুক্তযোদ্ধা সায়েদ সহ আরো নাম না জানা অনেক মুক্তি যোদ্ধার বধ্য ভূমির কথা লিখে ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে কেন? তারা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ।তারা আমাকে তাদের এলাকায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

আবুবকরপুর ওচমানগন্জ আমাদের পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন ।আমিনাবাদ ইইনিয়নের দালাল বাজার (বর্তমান নাম মাঝির হাট ) পুরানো বাজার।আমিনাবাদ হাইস্কুল পুরানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । ওচমান গন্জ ,আবুবকরপুর সে সময় উল্লেখ যোগ্য কোন বাজার কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলনা ওসমান গন্জের উত্তর অংশের মানুষ গজারিয়া এবং কর্তার হাট মুখী ছিল।দক্ষিন অংশের মানুষ আমিনাবাদ দালাল বাজার মুখী ছিল । পেয়ার আলী বেপারীর ক্যাম্প আমিনাবাদ এবং ওসমান গন্জের সীমানায় অবস্হিত । তা ছাড়া বিগত কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক ভাবে বিশেষ কিছু দায়িত্ব পালন আমার উপর অর্পিত ছিল ।যে কারনে ওসমান গন্জের সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা একটু বেশী।

গতকাল ২৮ মে সকাল আটটায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির অস্পষ্ট কিছু বিষয়ের তথ্য সংগ্রহে হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে বের হওয়া ।সফর সংগী উদীয়মান যুব নেতা আমার স্নেহাস্পদ ছাত্র ইমন ।গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় সে ওসমান জন্জ ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের জুনিয়র সমন্বয় কারী ছিল। তার বাইকে চরফ্যাসন থেকে আমার জন্মস্হান আমিনাবাদ হয়ে মাঝির হাটের পাশ দিয়ে সোজা উত্তর দিকে ওসমান গন্জের দিকে যাত্রা । যুদ্ধের সময় এ পথ ছিল অনেকটা ফাঁকা বিল ।মধ্যখানে আব্বাসিয়া মাঝি বাড়ী ,পাতাবাড়ী ,ঢালী বাড়ী ছিল ।তারপর ফাঁকা বিল । এই বিলের মধ্যেই হয়ে ছিল মুক্তি যুদ্ধ । সেই যুদ্ধের গল্প পাঠকের অপেক্ষার ফসল ।আজ সব বদলিয়ে গেছে । চারিদিকে বাড়ী আর বাড়ী।

আজ পেয়ার আলী বেপারীর ক্যাম্প সংলগ্ন বাংলা বাজার জমজমাট । স্বাধীনতার পরপর এই নামে বাজার প্রতিষ্ঠা করেন পেয়ার আলী বেপারীর নাতি আজহার বেপারীর ছেলে মুক্তিযুদ্ধা দৌলত খানের ওবায়েদ চেয়ারম্যান ।আমরা বাংলা বাজারে পেয়ারআলী বেপারীর ক্যাম্পের পাশে স্হাপিত তথাকথিত আবুবকর পর বধ্যভূমি পাড় হয়ে উত্তরে খোলা বিল পার হচ্ছি । সে সময় এই বিলকে আমরা বলতাম কালা বদর । সত্তর দশকের শেষের দিক থেকে আমিনাবাদ গজারিয়া প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হতো ।কখনো গজারীয় হাইস্কুল মাঠে ।কখনো আমিনাবাদ হাই স্কুল মাঠে । আমরা আমিনাবাদ ষ্টার ক্লাব থেকে বুট ছকস জার্সি পরে রওয়ানা হতাম ।আমিনাবাদ ইউনিয়নের বর্তমান আওয়ামীলীগ সভাপতি সে সময়ের ফুটবলার হোসেন মাতাব্বরের নেতৃত্বে এক দৌড়ে এই কালা বদর পাড় হয়ে সাত কিলোমিটার দূরে গজারিয়া মাঠে ফুটবল খেলতাম ।খেলা শেষে এক দৌড়ে এই কালাবদর পাড় হয়ে বাড়ী ফিরতাম ।আজ সেই বিলের মাঝ দিয়ে সুপ্রশস্ত পাকা রাস্তা দিয়ে চলছে আমাদের বাইক।

অল্প সময়ের মধ্যে আমরা মতলব মিয়ার হাটে পৌঁছলাম । এলাকার যুবক এবং মুরুব্বীরা আমাদের অপেক্ষায় ।মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ মিয়ার ছেলে আমার ছাত্র পুলিশে বাহিনীতে কর্মরত মো: নুরনবী বাজারের একটি দোকানে আমাদের বসার ব্যবস্হা করলেন । সবার সাথে কুশল বিনিময়ের ধারাবাহিকতায় এই এলাকার মুক্তিযুদ্ধ প্রসংগ উঠে এল । মুরুব্বীরা স্মৃতি চারন করলেন । নতুন প্রজন্ম গল্প।