মধ্যবিত্ত মানেই সংগ্রাম, মধ্যবিত্ত মানেই আত্মসম্মান হারানোর ভয়

বাংলার কলম বাংলার কলম

নিজস্ব ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:০৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২০ | আপডেট: ৮:০৪ অপরাহ্ণ

মধ্যবিত্ত একটি শব্দমাত্র কিন্তু এই ছোট্ট একটি শব্দ এতোটাই অর্থবহুল, যার অর্থ একটা অভিধানের ভিতর প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ছোট করে বলতে গেলে মধ্যবিত্ত বলতে এমন একটা জীবনকে বোঝায় যেখানে স্বাদ আছে কিন্তু সাধ্য থাকে না। মধ্যবিত্তদের পকেট ভর্তি টাকা থাকে না, কিন্তু মাথাভর্তি টেনশন ও বুকভরা স্বপ্ন থাকে। যে স্বপ্ন ঘিরে থাকে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে।

মধ্যবিত্তরা ধনীও নয় গরীবও নয়। মধ্যবিত্ত পরিবার পৃথিবীতে এসেছে শুধু সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার জন্য। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েদের মাথায় একটাই চিন্তা থাকে লেখাপড়া শেষ করে আয় রোজগার করতে হবে, সংসারের হাল ধরতে হবে।
মধ্যবিত্তদের একটা গুণ আছে সেটি হচ্ছে নিজেদের কষ্টগুলোকে চেপে রেখে বলে আমি অনেক ভালো আছি। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার পর্ব শেষ করতে হলে শরীরের রক্ত অর্ধেক শুকিয়ে যায় তার পরিবারের। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েদের বাবা-মায়ের স্বপ্ন অনেক বড় থাকে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা তাঁদের বাবা মায়ের স্বপ্নটাকেই নিজের স্বপ্ন করে জীবন যুদ্ধ শুরু করে।

আমি মনে করি পৃথিবীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি উচ্চবিত্ত তৈরি করতো এবং নিম্নবিত্ত তৈরি করতো তাহলে ভালো হতো। মধ্যবিত্ত তৈরি করার কোন যুক্তি নেই। মধ্যবিত্ত মানেই সমাজের অবহেলিত পরিবার।
পৃথিবীতে দুই শ্রেণির মানুষই যথেষ্ট- উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের আত্মসম্মানটা খুব বেশি থাকে। সে জন্মের সময়েই আত্মসম্মান সাথে করে জন্মায়। সে স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হয় এবং একপর্যায়ে সে বুঝতে পারে জীবনটা স্বপ্ন নয়, জীবনটা বাস্তবতা ঘিরেই। সে সব সময় সুখ খোঁজে, জীবনের মাঝে। সুখ খুঁজে বেড়ানো তার স্বভাব।

সে অল্পতে সন্তুষ্ট হতে পারে না। আবার অল্পতে অসন্তুষ্টও থাকতে পারে না। সে সবার কাছে ভালোবাসা খোঁজে কিন্তু, এটা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে অপরাধ। উচ্চবিলাসী হওয়া তার জন্য অপরাধ। ছেলেমেয়েদের থেকে বেশি স্বপ্নবিভোর থাকে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা- মা। তাঁরা স্বপ্ন দেখে তাদের ছেলে অনেক বড় হবে। এটাই হলো মধ্যবিত্ত পরিবার। আমি এরকম পরিবারের একজন ছেলে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়ায় মনে কোন আক্ষেপ নেই, নেই কোন রাগ, নেই কোন ক্ষোভ। বাবা-মায়ের ভালবাসা, সে কি জিনিস, সেটা হয়তো এই পরিবারে না জন্মালে বুঝতাম না। যে পরিবারে বাবা বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে উপার্জন করে, সেই পরিবারের ছেলে হয়েও একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই ঠান্ডা লাগে, একটু রোদে থাকলেই গরম লাগে, এগুলোর জন্য মাঝে মাঝে খুব কষ্ট অনুভূত হয়।
আবার যখন মনে পড়ে বাবার অতি যত্নে লালন করা, মায়ের কষ্টের বিণিময়ে হাসিখুশি রাখাটা তখন সবকিছু ভুলে আবার পথচলতে শুরু করি। কারণ আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। মধ্যবিত্তদের দেওয়ার মত মন মানসিকতা থাকে, অসহায়দের পাশে দাড়াতে মনটা আকুল হয়ে যায়, কিন্তু সাধ্য থাকে না।


আমার এই লেখাটি শুধুমাত্র বর্তমান করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি নিয়ে লেখা। উচ্চবিত্তরা জমানো টাকা দিয়ে পুরো মাসের খাবার সংগ্রহ করছে, নিশ্চিন্তে দিন কাটাচ্ছে, নিম্নবিত্ত ও অসহায়রা সরকার ও দাতাদের অনুদান পাচ্ছে। কিন্তু মধ্যবিত্তরা অনেক কষ্টে জীবন যাপন করছে। অনেকে কৃষিকাজের, ছোট ব্যবসা বা ছোট চাকরি দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে দিন পার করেছেন। কিন্তু আজ করোনার কারনে সবকিছু বন্ধ প্রায়। নেই কোন গচ্ছিত সম্পদ, নেই সংসারে গচ্ছিত চাল, ডাল তরকারি। তারা পারছেনা অসহায়ত্বের কথা কাউকে বলতে, আবার পারছেনা কারো কাছে হাত পাততে। সারা পৃথিবী জুড়ে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি যুগের পর যুগ নিরবে চোখের পানি ফেলে যায়। আত্মসম্মান তাদের কাছে পেটের ক্ষুধা থেকে অনেক শক্তিশালী হয়ে থাকায়, চোখের পানি দিয়েই জীবন অতিবাহিত হয় অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের।

কবির নেওয়াজ রাজ
সম্পাদক, মানুষের কল্যাণে প্রতিদিন