বাংলার আনাচে কানাচে অনেক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আছে যা ইতিহাসের পাতায় আসা দরকার

প্রকাশিত: ৭:৫৭ অপরাহ্ণ, জুন ৬, ২০২০ | আপডেট: ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

গৃহবন্দীর জবানবন্দী —৫৯

(হোম কোয়ারেন্টাইন জার্ণাল)

৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ বৃহস্পতিবার চরফ্যাসন পেয়ার আলী বেপারীর ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে রাজাকার বাহিনীর শোচনীয় চরম পরাজয় ভোলা মককুমা সদরের পাকবাহিনী এবং স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেননি । ইতোমধ্যে চরফ্যাসন থানা শান্তি কমিটির সেক্রেটারীকে গুলী করে হত্যার চেষ্টা, দুলারহাট দুইজন রাজাকারকে গুলী করে হত্যা । এসবের প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য মহকুমা হাইকমান্ডের নতুন এ্যাকশন প্লান তৈরী হলো । চরফাসন থানায় একের পর এক ঘটনা ঘটে চলছে ,যা ভোলার কোথাও ঘটছেনা ।চরফ্যাসন থানার শান্তি কমিটি ও তাদের সহযোগীদের নিয়ে ভোলা ওয়াফদা হেড কোয়াটারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হলো ।

এ সময় ৬ সেপ্টেম্বর দুলার হাট থেকে গ্রেফতার করে আনা আওয়ামীলীগের চার নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ কন্ট্রাক্টর ,জালাল মাস্টার , আজিজল হক বেপারী , নাসির আহাম্মদ ভোলা ওয়াফদায় বন্দী । বিভিন্ন তদবির এবং সুপারিশে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো ।

১১ সেপ্টেম্বর ,শনিবার ওয়াপদায় আটককৃত ঐ চার মুক্তিযোদ্ধাকে ভোলা খেয়া ঘাটে হত্যা করা হলো । তারপর চরফ্যাসনের শান্তি কমিটির হাই কমান্ডের নেতৃত্বে পাকবাহিনীর সুসজ্জিত একটি দল ঐ দিন চরফ্যাসনের উদ্দ্যশে রওয়ানা করে । পথে পথে তারা আওয়ামীলীগের অনেক নেতা কর্মীর বাড়ী ঘরে আগুন দেয় ।

অলিউল্লাহ মিয়াকে গুলীর পরদিন থেকেই আমাদের এলাকার মানুষ দক্ষিন অন্চলে প্রত্যেকের আত্মীয় স্বজনের বাড়ী আশ্রয় গ্রহন করেন ।৯ সেপ্টেম্বর পেয়ার আলী বেপারীর যুদ্ধের পর মুহূর্তের মধ্যে এলাকা জনশূণ্য হয়ে পড়ে । টিনের চাল ছাড়া কারো ঘরে কোন মালামাল ছিলনা । যে যেভাবে পেরেছে মালামাল হেফাজত করেছে ।মনে পড়ে আমার বড় ভগ্নিপতি আমার মায়ের জন্য বরিশাল থেকে পচাঁশি টাকা দিয়ে কাঠালি কাঠের একটি আলমারী এনেছিলেন । বাড়ির কাজের লোকের সাথে সহযোগিতা করে সব মালামাল হেফাজত করতে যেয়ে ঐ আলমারী পুকুরে ফেলেছিলাম ।আজও ঐ আলমারী খানা আমার গ্রামের বাড়ির ঘরে আছে । আলমারীটা যখন দেখি তখন সেই স্মৃতি মনে পড়ে ।

১১ সেপ্টেম্বর শনিবার এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ল । ভোলা থেকে পান্জাবীরা রওয়ানা করেছে ।আজ প্রত্যেকের বাড়ী ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিবে । তখন বর্ষাকাল । সকাল নয়টা কি দশটা বাজে ।আমার মাকে নিয়ে মেঝো ভগ্নিপতির বাড়ি পৈঁছে দেব । যাওয়ার পথে তাঁর ঘরের প্রতি বিদায় চাহনি আজও আমার চোখে ভাসে । তাঁর ধারনা বাড়ি ফিরে এ ঘর আর দেখবেনা । দেখবে আগুনে পোড়া ভস্মিভূত ছাই । প্রত্যেক গৃহিনীর ঘর সংসারের প্রতি মায়া মমতার এই করুন আকুতি যেন ।বের হয়ে আমাদের বড় পুকুরের পশ্চিম পাড় দিয়ে দক্ষিন দিকে যাচ্ছি ।দেখলাম আমার বাবা আমার একশত বছর বয়সী বৃদ্ধ দাদা রুস্তুম আলী মাঝিকে নিয়ে দক্ষিন পাড়ের নিচে আড়ালে বসে আছেন ।

বাড়ীর দক্ষিনে খোলা বিল । টানা আইল । চারিদিকে পানি থৈথৈ ।এক হাটু পানির মধ্য দিয়ে মাকে নিয়ে খস্তার খাল পাড় হয়ে আজহার বেপারী বাড়ির দরজা দিয়ে দুলার হাট গামী বিআরডিবি সড়ক পার হলাম । ভগ্নিপতির বাড়ির পথের মাঝামাঝি ভাংগা থালা । মাকে হাত ধরে পার করতেই মা পানিতে জোঁকের কিলবিল দেখে দিলেন লাপ ।গেলেন পানিতে পড়ে । এ সময় পূর্ব দিক থেকে সিকদার বাড়ির পুল পার হচ্ছে পাক বাহিনীর গাড়ী ।আতংকে কাপঁছে সারা শরীর ।মাকে টেনে তুলে কোন রকম দৌড়ে ভগ্নিপতির পুকুর পাড়ের গাছের আড়ালে দাঁড়ানো । পাকবাহিনীর সাত আটটি সাঁজোয়া গাড়ী পশ্চিম দিকে গিয়ে বসারত উল্লাহ চৌমহনী হয়ে উত্তর দিকে মাঝির হাটের দিকে যাচ্ছে ।

আমি মাকে রেখে আবার একই পথে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম ।বাড়ীর দক্ষিনে আমাদের মাছের কুয়া। সেখানে পৌঁছে আমার ছোট ভগ্নিপতির সাথে দেখা ।সে আমাদের খোঁজ খবর নিতে এসেছে ।হঠাৎ বিকট শব্দ । কি একটা শব্দ যেন চারিদিকে শুধু ঘুরছে । মনে হলো রনক্ষেত্র ।মাঝির হাটে ,আশে পাশে আগুনের কুন্ডলী দেখা গেল ।দাউ দাউ করে সব জ্বলছে ।কোথাও মানুষের কোন আত্মচিৎকার নেই ।কেননা ইতোপূর্বে সব মানুষ গ্রাম ছাড়া । মুক্তিযোদ্ধারাতো ৯ সে্প্টেম্বর যুদ্ধের পর অন্যত্র চলে গেছে । পাকবাহিনী এখন খোলা ময়দানে একতরফা যেন কামান হাকাচ্ছে ।আমরা অবস্হা ভয়াবহ দেখে উপুর হয়ে শুয়ে পড়লাম । সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ওরা আবার একই পথে চলে গেছে ।চরফ্যাসন বাজারের আশে পাশে আওয়ামীলীগ নেতাদের আরো কিছু বাড়ীতে আগুন দিল ।চরফ্যাসন বাজারের বিনোদ বিহারীর দোকান লুট করে ত্রাশ সৃষ্টি করলো ।

আমরা গেলাম মাঝির হাট ।দেখলাম নিরীহ মানুষের ঘর বাড়ী দোকান পাট পোড়ার করুন দৃশ্য । মাঝির হাটের দক্ষিন পাশে আমিনাবাদ গ্রামের মধ্যে দরিদ্র অসহায় মানুষের ঘর গুলো পুড়ে দিয়েছে ।জানা গেছে যে কয়জন রাজাকার নয় তারিখের যুদ্ধে পালিয়ে বেঁচেছে , তারা পাকবাহিনীর সাথে এসেছে ।তাদের দিক নির্দেশনায় এসব বাড়ী ঘর পোড়ানো হয়েছে ।কারন এসব বাড়ী ঘরে সেদিন তারা পালাতে এসে আশ্রয় পায়নি ।বরং মহিলাদের হাতে ঝাড়ু পেটা খেয়ে ছিল ।সেই প্রতিশোধ নেয়া ।

পাক বাহিনী সেদিন যেসব ঘরে আগুন দিয়েছে তার তালিকায় রয়েছে , আমিনাবাদ গ্রামের হোছন আলী দরজী পিতা আশ্রাদ আলী দরজী ,দেলোয়ার হোসেন বেপারী পিতা জাবেকশ বেপারী ,হায়জত আলী বেপারী পিতা জাবেকশ বেপারী ,মজিবল হক ফরাজী পিতা হাছন আলী ফরাজী ,তোফাজ্জল হক ফরাজী পিতা হাছন আলী ফরাজী , ছেলামত মাতাব্বর পিতা আ: আজিজ মাতাব্বর , আলী আহাম্মদ মুন্সী পিতা আ: আজিদ মাতাব্বর ,ফজলে করিম পিতা ছেলামত মাতাব্বর , মিছির আহাম্মদ কোতোয়াল পিতা সুলতান কোতোয়াল , আ: রশিদ জমাদার পিতা হাসিম জমাদার ,রচুমদ্দিন জমাদার পিতা মেহের আলী জমাদার , সোনামিয়া সরদার পিতা জব্বর আলী সরদার , রচুমদ্দিন সরদার পিতা জব্বর আলী সরদার , নুরমোহাম্মদ (নুরু)সরদার পিতা ফজর আলী সরদার ।

মাঝির হাটে যে সব দোকানে আগুন দিয়েছে তার তালিকায় রয়েছে হালিমাবাদ গ্রামের মোক্তার আহাম্মদ সরদার পিতা আ:আজিদ সরদার , ফজলুরর রহমান জমাদার পিতা আ:আজিজ জমাদার ,খোরশেদ আলম মাঝি , ফজলুর রহমান মাঝি , আবদুস সালাম মাঝি , গোলাম কাদের মিন্টু মাঝি সর্বপিতা কেরামত আলী মাঝি , আবদুস ছোবহান ফরাজী ,আ:রব ফরাজী সর্ব পিতা সৈয়দ আলী ফরাজী, মোখলেছুর রহমান