ফল হয়নি মনের মতো, তাতে কী?

মোঃ শাহিন মোঃ শাহিন

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ২:০৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৯ | আপডেট: ২:০৮ অপরাহ্ণ

সন্তান পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করেনি। ওর নিজেরই মন খারাপ। অভিভাবক হিসেবে এখন ওর পাশে থাকাটাই জরুরি। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করলে ওর মনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একবার ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবন শেষ নয়। শুরু হোক আবার নতুন করে পথচলা।

‘এখন কী হবে, তুষার (ছদ্মনাম) তো এইচএসসিতে জিপিএ–৫ মিস করে গেল! এখন তো কোত্থাও ভর্তি হতে পারবে না।’ ফলাফল শুনেই হায় হায় করে উঠলেন তুষারের মা। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এলেন পাশের বাসার ভাবি মিসেস এলিনা (ছদ্মনাম)। ওনার মেয়ে সগৌরবে জিপিএ–৫ পেয়েছে। তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে উনি বললেন, ‘তাতে কী হয়েছে, তুষার না হয় বাবার ব্যবসা দেখবে, ও তো একটু কম পড়েছিল, সেই তুলনায় অনেক ভালো করেছে। দেখেন না আমার মেয়ে সারা দিন পড়ে সেই জিপিএ–৫, এখন তো ভর্তির জন্য যুদ্ধ।’ প্রতিবেশী আর স্বজনদের কথায় আরও মুষড়ে পড়েন তুষারের মা। সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ে তুষারের ওপর, প্রচণ্ড গালমন্দ করতে থাকেন।

কেবল তুষারের মা একাই নন। সন্তান যদি পরীক্ষায় আশানুরূপ রেজাল্ট না করে, তখন অনেক মা–বাবা দুঃখ পান, রেগে যান আর তাঁদের যাবতীয় নেতিবাচক আবেগের বোঝা গিয়ে পড়ে সন্তানটির ওপর। তাঁরা ভুলে যান সফলতার মতো ব্যর্থতাও জীবনের একটি অনুষঙ্গ। ফলে ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মতো তৈরি করতে হবে তাঁদের সন্তানকে। ব্যর্থতা মানে যে সব শেষ তা নয়, নতুন করে সফলতার দিকে যে এগোনো যায়, তা সন্তানকে শেখাতে হবে। আর যদি সব সময় ‘সফল হতে হবে’, ‘সেরা হতে হবে’—এমন মন্ত্র সন্তানের কানে ঢোকানো হয়, তবে সে ব্যর্থতাকে মেনে নিতে না পেরে যেকোনো সময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেকোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। মা–বাবারাও নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ভাবনা আর নিজেদের সামাজিক অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাবে ভেবে সন্তানকে ধমক দেন, বিদ্রূপ করেন। সন্তানের মনে এমন ভাবনা জন্মে যে পরীক্ষায় মা–বাবার চাহিদামতো রেজাল্ট না করায় সে নিজ পরিবারের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে! এই ভাবনা তাকে বাধ্য করে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে। গুটিয়ে থাকতে থাকতে তার মধ্যে তৈরি হয় মানসিক চাপ (অ্যাকিউটস্ট্রেস) আর বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন)।

সন্তানকে মানসিক চাপ আর বিষণ্নতা থেকে দূরে রাখতে রেজাল্টের পর মা–বাবার আচরণ হতে হবে সংবেদনশীল আর ইতিবাচক। সংবেদনশীল আচরণ না হলে সন্তানের মানসিক শক্তি কমে যাবে, সামাজিক দক্ষতা বাড়বে না। সন্তানের পরীক্ষার ফল প্রত্যাশিত না হলে ভেঙে না পড়ে, সন্তানের সঙ্গে বিরূপ আচরণ না করে, তার যেটুকু অর্জন হয়েছে সেটাকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে সে ভবিষ্যতে মানসিক চাপ আর বিষণ্নতামুক্ত জীবন যাপন করতে পারে।

সন্তানের পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না হলে একটু বিরতি দিয়ে পারিবারিক আনন্দের মাধ্যমে আবার তাকে লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনুন।

আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবের সন্তানের সঙ্গে নিজের সন্তানের তুলনা করতে থাকলে এবং তাদের ফলের সঙ্গে সন্তানের ফলের তুলনা করে অযথা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেন না। এই প্রতিযোগিতা সন্তানের মানসিক বিকাশের অন্তরায়, যা তাদের ক্যারিয়ার গঠনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। 

সন্তানের পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না হলে মা–বাবারা যা যা করতে পারেন। 

● অধৈর্য হবেন না

চিৎকার করা, ধমক দেওয়া বা উপদেশ কোনো ভালো ফল আনে না, তাই ধৈর্য ধরুন। শান্ত থাকুন। পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য বড় পুরস্কার যেমন কোনো উপকারী নয়, তেমনি খারাপ ফলের জন্য তিরস্কার কোনো সুফল আনে না। 

● সন্তানের মনের যত্ন নিন

প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় সন্তান নিজেও মন খারাপ করেছে। তার পাশে বন্ধুর মতো থাকুন। তার ক্ষতিগ্রস্ত মনের যত্ন নিন। তাকে সাহস দিন। 

● তুলনা করবেন না

সন্তানের ফলাফল যেমনই হোক না কেন, তাকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করে তার মনে আঘাত দিয়ে কথা বলবেন না। ফলাফলের জন্য তাকে ব্যঙ্গ করা যাবে না। 

● উদ্‌যাপন করুন

সন্তানের ফলাফল আপনার মনমতো না হলেও সেই ফলাফল উদ্‌যাপন করুন। ছোটখাটো উপহার দিন বা পছন্দের খাবার খেতে দিন। 

● অন্য কাউকে দায়ী করবেন না

ফলাফলের জন্য শিক্ষক/অন্য কাউকে দায়ী করবেন না। সন্তানের সামনে তার অপ্রত্যাশিত ফলের জন্য কারও সমালোচনা করবেন না। 

● নিজের মনের যত্ন নিন

সন্তানের ফল আশানুরূপ না হলেও আপনি নিজেকে সামলে রাখুন। ভেঙে পড়বেন না। বিষণ্নতামুক্ত থাকার চেষ্টা করুন। আপনি ভেঙে পড়লে সন্তানের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কমে যাবে। 

● প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ

পরীক্ষায় অপ্রত্যাশিত ফল হলে সন্তানের মধ্যে বিষণ্নতাসহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন।

সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।