অধ্যক্ষ কায়সার আহম্মদ দুলাল স্যারের (হোম কোয়ারেন্টাইন জার্ণাল-৪৯)

প্রকাশিত: ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০ | আপডেট: ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ

গৃহবন্দীর জবানবন্দী——৪৯

(হোম কোয়ারেন্টাইন জার্ণাল)

১৬ মে ২০২০ হোম কোয়ারেন্টাইন জীবনের প্রাচীর ভেংগে সামাজিক কাজে চরফ্যাসন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের গাড়ীতে ওসমানগন্জ ইউনিয়নে যাত্রা । উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আখন , আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদক নুরুল ইসলাম ভিপি , সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম মোর্শেদ সহ আমরা আমিনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের পাশ দিয়ে পাকা সড়ক বেয়ে গাড়ী উত্তর দিকে চলছে ।এই রাস্তা ,এই পথ কত স্মরণীয় ।চরফ্যাসন উপজেলায় প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্হান ।সে সময় ওসমান গন্জ ইউনিয়ন সীমানা পর্যন্ত ফাঁকা বিল ছিল ।আমিনাোদ ওসমান গন্জ ইউনিয়ন বর্ডারের মুখারবান্দা খালের উপর বাদাম গাছের সাঁকো ছিল । আজ সেই সাঁকো পাকা ব্রিজ । ব্রিজ পার হলেই স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন নামে বাংলাবাজার ।বর্তমানে ওসমান গন্জ ইউনিয়ন ভেংগে আবুবকরপুর ইউনিয়নের অংশ ।বাম পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐতিহাসিক পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্প।

ক্যাম্পের কোন চিণ্হ আজ আর নেই । দীর্ঘ কাল পর ২০১৯ সালে এখানে একটি স্মৃতিফলক তৈরী করা হয়েছে । দূর্ভাগ্য স্মৃতি ফলকের গাত্রে ইতিহাস বিকৃতির পেরেগ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে ।ঠিকাদার টাইলসের ফলকে লিখে দিয়েছে, “আবুবকপুর
বধ্যভূমি “ শহীদ মোস্তাফিজুর রহমান , শহীদ সাইদুল ইসলাম নাম না জানা আরো অনেক শহীদ ।”এই বিকৃত ইতিহাস যে আজই প্রথম দেখলাম ,তা নয় ।আমার নজরে অনেক পূর্বেই পড়েছে । অথচ এটা বধ্য ভূমি নয় ।এখানে কোন বধ্যভূমি নেই ।চরফ্যাসন কোন বধ্যভূমি নেই ।এখানে কোন মুক্তি যোদ্ধা ঘুমিয়ে সেই ।এখানে কোন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা অন্য কারো কবর নেই ।এখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাইদ এবং মোস্তাফিজের কোন কবর নেই ।তা হলে কেন এখানে বধ্যভূমির সাইন বোর্ড লাগানো হলো ?

২০১৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত চরফ্যাসন উপজেলা পরিষদের সভা এবং উপজেলা আইন শৃংখলা কমিটির সভায় এই বিকৃত ফলক অপসারণের দাবী জানিয়ে বক্তব্য রেখেছি । সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্হিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্হায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এমপি। সভায় সভাপতি ছিলেন চরফ্যাসন উপজেলা নির্বাহি অফিসার মো: রুহুল আমিন ।২০২০ মহান স্বাধীনতা দিবসের পূর্বে উপজেলা নির্বাহি অফিসারকে ফোনে বিষয়টি গুরুত্ব বিবেচনা করে সংশোধন করার অনুরোধ করেছিলাম । তার পর এলো করোনার আধিপত্য বিস্তার । করোনার মতো এই ভ্রান্ত ইতিহাস বিকৃতি নতুন প্রজন্মকে সংক্রামিত করছে ।

এসব ভাবতে ভাবতে আমাদের গাড়ী বাংলা বাজার পার হয়ে আড়াই কিলোমিটার উত্তরে মতলব মিয়ার বাজার হয়ে ওসমান গন্জ সীমানা ঘেষে পূর্ব দিকে মিয়া বাড়ীর দিকে যাচ্ছি । ডান পাশে খালের দক্ষিন পাড় আবুবকরপুর সীমানায় দালাল বাড়ীর সুপাড়ির বাগানে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোস্তাফিজুর রহমান এবং শহীদ সাইদুল হকের কবর । কিছুদিন পূর্বে আওয়ামীলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম মোর্শেদকে নিয়ে আমি তাদের কবর জিয়ারত করেছি।যে কবর টি জননেতা জ্যাকব এমপি মহোদয়ের টাকায় পাকা করা । অথচ তাদের বধ্যভূমি বানানো হয়েছে বাংলা বাজার ।এহেন ইতিহাস বিকৃতি দেখলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য পরিবেশনে ভয় পাওয়ার কথা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. হারুন অর রশিদ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন । তার পক্ষে কলেজ পরিদর্শক মো: মনিরুজ্জামান শাহিন চরফ্যাসনের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের কাজ করছেন। ইতোমধ্যে তার কাছে অনেক তথ্য জমা হয়েছে। কিছু তথ্যের কপি তিনি আমার মতামতের জন্য পাঠিয়েছেন ।যা পড়ে আমি নিজেও বিভ্রান্ত হচ্ছি। পন্চাশ বছরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নানা ভাবে পথ হারিয়েছে ।অনেকের তথ্যে দেখা দিয়েছে সত্য আড়াল করে অন্যকে অনাবশ্যক তুষ্ট করার চেষ্টা।

চরফ্যাসনের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখবেন ইতিহাসবিদ। চরফ্যাসনে প্রথম মুক্তিযুদ্ধ সেই ইতিহাসের অংশ মাত্র। তার আংশিক আমার হোম কোয়ারেন্টাইন জার্ণালে তুলে ধরার চেষ্টা মাত্র ।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের নির্দেশে দক্ষিন ভোলায় মুক্তযুদ্ধে্র প্রধান সংগঠক , রাজনীতির প্রভাত পুরুষ, স্বাধীন বাংলাদেশে দক্ষিন ভোলার প্রথম সংসদ সদস্য মোতাহার উদ্দীন মাস্টারের নেতৃত্বে চরফ্যাসন থানা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় । অনুরুপ প্রতিটি ইউনিয়নে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় ।গঠন করা হয় ছাত্র যুবক কৃষক সংগ্রাম পরিষদ । আবদুল মান্নান হাওলাদার পিতা আবদুল কাদের হাওলাদার সাং আমিনাবাদ চরফ্যাসন থানা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি এবং নেতাজী ছালামত উল্লাহ মিয়া পিতা ফজলে রহমান মিয়া সাং ভদ্রপাড়া জিন্নাগড় চরফ্যাসন থানা সংগ্রাম কমিটির সেক্রেটারী ছিলেন ।অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সংগ্রাম কমিটি সহ অন্যান্য কমিটির বিভিন্ন পদে ছিলেন ।দুলার হাট এলাকায় সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জালাল আহাম্মদ মাস্টার পিতা,জব্বর আলী মাঝি সাং চর যমুনা, এবং সংগ্রাম কমিটির সেক্রেটারী মোহাম্মদ উল্লাহ কন্ট্রাক্টর পিতা আবদুস ছোবহান মাতাব্বর সাং চর তোফাজ্জল।

এ সময় পাকিস্তান সরকারের মদদপুষ্ট মুসলীম লীগ , জামায়াতে ইসলামী , নেজামে ইসলাম এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে চরফ্যাসন থানা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি কমিটি , রাজাকার এবং আলবদর বাহিনী গঠন করা হয় । মুসলীম লীগ সভাপতি আবদুর রব আনসারী পিতা আসলাম হাওলাদার সাং আসলামপুর ,চরফ্যাসন থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এবং নেজামে ইসলামীর সভাপতি ওয়ালিউল্যাহ মিয়া পিতা আরব আলী হাওলাদার সাং জিন্নাগড় ,,চরফ্যাসন থানা শান্তি কমিটির সেক্রেটারী ছিলেন ।অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ শান্তি কমিটিসহ অন্যান্য কমিটির বিভিন্ন পদে ছিলেন ।

মার্চ মাস থেকেই আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে অবসর প্রাপ্ত সেনাবাহনীর লোকদের মাধ্যমে এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়নে বাঁশের লাঠি এবং ডামি রাইফেল দিয়ে যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষন চলে ।অবসর প্রাপ্ত সেনাবাহিনী এবং কর্মরত সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য দেশ মাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয় ।অন্যদিকে এপ্রিল মাস থেকে চলে স্বাধীনতা বিরোধী ক্ষমতাসীন দলের রাজকার ভর্তি কার্যক্রম ।সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় তাদের এ্যাকশন প্লান কার্যক্রম । স্বাধীনতার পক্ষ সমর্থন কারীদের বাড়ী ঘর লুট