অধ্যক্ষ কায়সার আহম্মদ দুলাল স্যারের লিখনিতে মুক্তিযুদ্ধে চরফ্যাশনের অবদান

প্রকাশিত: ১:২৬ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০ | আপডেট: ১:২৬ অপরাহ্ণ

★★★গৃহবন্দীর জবান বন্দী—৫৩★★★ (হোম কোয়ারেন্টাইন জার্ণাল)

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ভোলা জেলায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ চরফ্যাসন পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্প থেকে শুরু হয় ।এর পূর্বে জেলার বিভিন্ন স্হানে মুক্তি যোদ্ধাদের হাতে রাজাকার এবং রাজাকারের হাতে মুক্তিযোদ্ধা মারা গিয়েছে ।কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভাবে অগ্নি সংযোগ ঘটেছে । মুক্তিযোদ্ধা রাজাকারের মধ্যে সামনা সামনি প্রথম মুক্তি যুদ্ধ হিসেবে পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্পের মুক্তি যোদ্ধাদের সফল মুক্তিযুদ্ধ । এই যুদ্ধে কোন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়নি ।মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটজন রাজাকার মারা যায় ।এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা তেরটি রাইফেল উদ্ধার করে । এটি ভোলা জেলায় প্রথম সফল মুক্তিযুদ্ধ ।

আগষ্ট মাসের শেষ সপ্তাহে পেয়ার আলী বেপারীর ক্যাম্পে নকশাল পন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্হান । সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এই ক্যাম্পটি নিরাপদ স্হানে অবস্হিত । পেয়ার আলী বেপারীর সন্তান মোজাফ্ফর বেপারীর ছেলে মোস্তাফিজ এবং জেবল হক বেপারীর ছেলে সাইদুল হকের নেতৃত্বে তাদের চরের জমাজমির বাসা বাড়ীতে এই ক্যাম্প করা হয় ।আশে পাশের এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কিংবা স্বাধীনতার স্বপক্ষের কিছু মানুষের এখানে আনাগোনা ছিল । এই ক্যাম্পে নোয়াখালী থেকে নকশাল পন্থি একটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ যোগ দেয় ।ক্যাম্পে বাজার করে দিতেন অর্ধ কিলোমিটার পূর্ব পাশের আবুবকরপুর মৌজার মুকবুল দেওয়ালের ছেলে নুর সোলায়মান।ক্যাম্পে রান্না করতেন ঐ এলাকার ওহাব চোরার স্ত্রী মনোয়ারা ।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ , সোমবার । দুলারহাট থেকে মাছ ধরার জন্য জাল কিনে এনে বাড়ীর দরজার কাচারীতে বসে সন্ধ্যার পর জাল সেলাই করছিলেন নুর সোলায়মান । নুর সোলায়মান গ্রামের টুকটাক বিচার শালীশ করতেন । সেই সুবাদে মনোয়ারা স্বামী ওহাব চোরার বিরুদ্ধে বিচার নিয়ে আসে নুর সোলায় মানের কাছে । নুর সোলায়মান তার বিচার করতে পারবে না এবং উল্টো মনোয়ারার দোষ উল্লেখ করে শাসিয়ে দেয়। মনোয়ারা কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে যায় ।পথে দেখা হয় পাশের বাড়ীর রুস্তুম আলী দেওয়ালের ছেলে দেলোয়ারের সাথে । রুস্তুম আলী দেওয়ালের আর এক ছেলে বেলায়েত হোসেন চরফ্যাসন থানা রাজাকার বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ।সে মরহুম ওয়াহেদ আলী মালতিয়ার জামাতা , মুক্তিযোদ্ধা হাসানুজ্জামান মালতিয়ার ভগ্নিপতি ।

রুস্তুম আলী দেওয়াল আর মুকবুল দেওয়াল একই গোষ্ঠির লোক ।উভয় পরিবারের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ ছিল । দেলোয়ার মনোয়ারার কান্নার কারন জেনে উল্টা পরামর্শ দিল । মনোয়ারা সেই পরামর্শ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে নুর সোলায়মানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয় । অভিযোগের ধরন ছিল , নুর সোলায়মান মুক্তিযোদ্ধা না ।সে রাজাকার ডেপুটি কমান্ডার বেলাযেতের চাচাত ভাই । নুর সোলায়মান স্পাই ।সব তথ্য সে বেলায়েতের কাছে সরবরাহ করে দেয় ।

নকশাল পন্থি মুক্তিযোদ্ধারা যে কোন মুহূর্তে হটকারি সিদ্ধান্ত নিত ।অনেক বিষয়ে তারা কারো সাথে আপোষ করতোনা । তাদের মধ্যে সর্বত্রই একগুয়েমী ছিল । সেই স্বভাবগত কারনেই এই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা বিষয়টি অধিকতর যাচাই না করে তাৎক্ষনিক নুর সোলায়মানের বাড়ী আসে । তাদের কাচারী ঘর থেকে তার ছোট ভাই নুরুজ্জামানের সামনে থেকে নুর সোলায়মানকে মুক্তিযোদ্ধারা ধরে নিয়ে যায় ।তাদের বাড়ীর সামনে মুখারবান্দা খালের পাড় নিয়ে বেনোয়েট চার্জ করে তাকে খালে ফেলে দেয় । মুক্তিযোদ্ধারা মনে করেছে নুর সোলায়মান মারা গেছে । তারা চলে গেলে নুর সোলায়মান কোকাতে কোকাতে বাড়ী ফিরে আসে ।

তখন বর্ষাকাল ।আহত নুর সোলায়মানের অবস্হা আশংকা জনক । সে বেঁচে আছে জানলে পুনরায় সমস্যা হতে পারে ।যে কারনে তাদের পাশের গাইন বাড়ী নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয় । প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে ঐ রাতে ডেকে আনা হয় বাবু মিহির চন্দ্র মজুমদার ওরপে মিন্টু ডাক্তারের নানা দেবেন্দ্র ডাক্তারকে ।তিনি চিকিৎসা করালেন । কিন্তু কোন ফল হলোনা ।পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর মংগলবার নুর সোলায়মান মারা যান । এলাকায় থমথমে পরিবেশ ।যে কারনে নিজেদের বাড়ীর কবরে তাকে দাফন করা হয়নি । বর্তমান ওচমান গন্জ ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ড । তাঁদের গোষ্ঠির আর এক বাড়ী সামছল হক দেওয়াল বাড়ীর কবরস্হানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুর সোলায়মানকে দাফন করা হয় । ভোলা জেলার মধ্যে নুর সোলায়মানের মৃত্যু মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মঘাতি প্রথম মুত্যু ।

নুর সোলায়মানের মৃত্যুর পর এলাকায় গুন্জন; মুক্তিযোদ্ধারা মিথ্যা তথ্যের উপর ভিত্তি করে নুর সোলায়মানকে হত্যা করেছে । ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তারা মনোয়ারাকে গ্রেফতার করে ।তার উপর চাপ প্রয়োগ করলে সে দেলোয়ারের কু পরামর্শে মিথ্যা তথ্য পরিবেশনের কথা ফাঁস করে দেয় । মুক্তিযোদ্ধারা ক্রোধে মনোয়ারার পীঠে বেনোয়েট দিয়ে আঘাত করে । মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ করতে যেয়ে শুনেছি মনোয়ারা বর্তমানে দক্ষিনে জাইল্লার চর বসবাস করে ।

৭ সেপ্টেম্বর মংগল বার তাৎক্ষনিক ভাবে মুক্তিযোদ্ধারা দেলোয়ারকে গ্রেফতার করে। তাদের বাড়ীর ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় ।তাকে হত্যা করে তার লাশ বস্তায় ভরে মুখারবান্দা খালে ভাসিয়ে দেয় । সংগত কারনে দেলোয়ারের এই হত্যা তার ভাই চরফ্যাসন থানা রাজাকার ডেপুটি কমান্ডার বেলায়েত হোসেন মেনে নেয়নি ।ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সে চরফ্যাসন থানা পুলিশ বাহিনী এবং রাজাকার বাহিনীকে সংগঠিত করে পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্প আক্রমনের প্রস্তুতি গ্রহন করে । ঘটনার ধারাবাহিকতায় সংগঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ । সেই যুদ্ধই পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্পের মুক্তি যুদ্ধ ।সেই যুদ্ধের গল্প দ্রুত শুরু করা দরকার ।

হোম কোয়ারেন্টাইন জীবন থেকে পারিবারিক জীবন এখন বেশী ঝুকি পূর্ন। করোনাকে এখন অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে ।অবাধ বিস্তার তার । হোম কোয়ারেন্টাইনের সতর্কতা পারিবারিক জীবনে নেই । করোনাকে জয় করার তরিকা এখন আর নেই । করোনার কাছে মাথা নত করেই এখন পারিবারিক জীবন । সেই জীবন যেন অনিশ্চিত পথে হাটা । মুক্তিযুদ্ধের গল্প দ্রুত শেষ করতে হবে ।কেননা জীবন সংগ্রামে আমরা ব্যস্ত হয়ে পরছি ।তখন গল্প নয়, জীবন হবে গল্পের ক্রীড়ানক ।(চলবে)